নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন সংরক্ষণে প্রস্তুত চট্টগ্রাম। ইতোমধ্যে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে দুটি ওয়াক ইন কুলার (ডবিøউআইসি)। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলায় প্রস্তুত করা হয়েছে আইচ লাইন রেফ্রিজারেটর (আইএলআর) ও কোল্ড রুম। গত ১০ জানুয়ারি সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডাইরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ইপিআই শাখায় কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন রাখার ওয়াক ইন কুলার এবং জেলা সিভিল সার্জন উপজেলা পর্যায়ের আইচ লাইন রেফ্রিজারেটর ও কোল্ড রুমসহ সামগ্রিক প্রস্তুতি পরিদর্শন করেছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রদানে সরকারের সঙ্গে ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়। দেশে ভ্যাকসিনগুলো আসার পর পরই জেলা ভিত্তিক তার সরবরাহ করা হবে। তাই ভ্যাকসিনগুলো ডবিøউআইসি, আইএলআর ও ডিপ ফ্রিজে রাখার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ২৯ জেলায় ডবিøউআইসি আছে, আরও ১৮ জেলায় এটি দেয়া হবে। অন্যান্য জেলায় আইএলআর ও ডিপ ফ্রিজ আছে। এক একটি ডবিøউআইসিতে ৭৫ হাজার ভায়াল কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন (৭ লাখ ৫০ হাজার ডোজ) ও আইএলআর ফ্রিজে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার ভ্যাকসিন রাখা যাবে। তাপমাত্রা থাকবে ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জেলা সদর থেকে কোভিডের ভ্যাকসিন উপজেলা পর্যায়ে প্রতিবার ৬-১০ হাজার ডোজ কোল্ড বক্সে করে পাঠানো হবে। পরে সেখান থেকে কোল্ড ক্যারিয়ারে করে ইউনিয়ন পর্যায়ে ভ্যাকসিন পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে। তবে ইপিআই টিকা আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা থাকবে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘জেলা-উপজেলায়ও করোনার ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে। এ জন্য ভ্যাকসিনগুলো সংরক্ষণে জেলার দুটি ওয়াক ইন কুলার এবং প্রতিটি উপজেলায় আইএলআর ও ডিপ ফ্রিজসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে পটিয়া, চন্দনাইশ উপজেলার প্রস্তুতি সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। বাকিগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জেলা সদর থেকে কোভিডের ভ্যাকসিন উপজেলা পর্যায়ে প্রতিবার ৬-১০ হাজার ডোজ কোল্ড বক্সে করে পাঠানো হবে। এ কার্যক্রম আরও বেগবান করতে সরকারি উদ্যোগে ভ্যাকসিনের সিরিঞ্জ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদিও দেওয়া হবে। সরকারি ভ্যাকসিন প্রদানে নিয়োজিতরাই করোনার ভ্যাকসিনের দায়িত্ব পালন করবেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।’ সিভিল সার্জন বলেন, ‘টিকা প্রদানে জনবলের কোনো সমস্যা হবে না। স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্স দিয়েই টিকাদান কার্যক্রম চালানো যাবে। এমনটি ইউনিয়ন পর্যায়েও টিকা দেওয়া সক্ষমতা আছে।’
বাড়ছে উপসর্গহীন করোনা সংক্রমণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে উপসর্গহীন করোনায় সংক্রমণ ক্রমাগত হারে বাড়ছে। তাছাড়া সংক্রমণমুক্ত হওয়ার পর করোনা পরবর্তী স্মৃতিদুর্বলতা, শারীরিক ব্যথা, ঘুমে ব্যাঘাতসহ নানা জটিলতটায় ভুগছেন আক্রান্তদের মধ্যে একটা বড় অংশ। তবে করোনা আক্রান্তদের ৯০ ভাগেরই ইতোপুর্বে সবগুলো টিকা নেয়া আছে।
দেশের সাত প্রতিষ্ঠানের একদল গবেষকের ‘নিউ মাইক্রোবস এন্ড নিউ ইনফেকশান’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। করোনার হটস্পট খ্যাত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়নগঞ্জে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ২১ জন রোগীর উপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণা সমন্বয় করেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডা. এইচএম হামিদুল্লাহ মেহেদী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. আদনান মান্নান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারহানা আক্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. মুশতাক ইবনে আয়ুব। তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করেন স্বাস্থ্য অর্থনিতিবিদ ও চবির শিক্ষক ড. নঈম উদ্দিন হাছান চৌধুরী। গবেষণা তত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন রোগতত্ববিদ ডা. মো. ওমর কাইয়ুম, ঢাকা মহানগর হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ডা. সানজিদা হোসেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ডা. প্রসূন বিশ্বাস এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আবদুর রব মাসুম। গবেষণার সামগ্রিক তত্ত¡াবধানে ছিল ডিজিজ বায়োলজি এন্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রæপ চট্টগ্রাম।
গবেষণায় বলা হয়, আক্রান্তদের ৭৫ শতাংশই পুরুষ। এর মধ্যে ৩০ শতাংশের বয়স ৩০-৩৯ বছর। আক্রান্তদের মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি রোগীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ডি ডাইমার এবং ফেরিটিন বেড়ে যায়। কভিড থেকে সুস্থ হওয়ার চার সপ্তাহ পরেও আক্রান্তদের এক চতুর্থাংশের মধ্যে ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, বিষণœতা ও নিরবিচ্ছিন্ন, ঘুম বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রতিমাসে উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা প্রায় দেড়গুণ করে বেড়েছে। কভিড-১৯ আক্রান্তদের ৯০ ভাগেরই ইতোপুর্বে সবগুলো টিকা নিয়েছেন। সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়েছে বি পজেটিভ (৩৬ শতাংশ) এবং ও পজেটিভ (২৯ শতাংশ) বøাড গ্রæপের রোগীরা। উপসর্গযুক্ত রোগীদের মধ্যে অর্ধেকেরই ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ৭০ ভাগ রোগীর চিকিৎসাতেই অ্যাজিথ্রোমাইসিন বা জিম্যাক্স এবং ৪৫ ভাগের ক্ষেত্রে ডক্সিসাইক্লিন ব্যবহৃত হয়েছে। কভিডের পূর্বে যারা দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ গ্রহণ করছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে কভিড পরিবর্তি জটিলতা দেখা যাচ্ছে। ১০ দশমিক ১১ শতাংশ রোগী উপসর্গবিহীন ছিল। এছাড়াও যাদের দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে, যেমন ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগ তাদের কভিডে আক্রান্ত হওয়ার হার এবং কভিড পরবর্তি জটিলতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষকদলের প্রধান ডা. হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, গবেষণায় কভিড-পরবর্তি প্রতিক্রিয়াকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। দেখা গেছে দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভোগা মানুষরাই বেশি ঝুঁকির মুখে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমাদের এই গবেষণাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া গবেষণায় কভিডপরবর্তী জটিলতার যে চিত্র পাওয়া গেছে তা ভবিষ্যতে এ রোগ থেকে সেরে ওঠা মানুষজনের অন্যান্য রোগের ধরন অনুসরণে সহায়ক হবে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আদনান মান্নান বলেন, ‘ইতোপুর্বে একটি গবেষণায় ডায়বেটিস রোগীদের মধ্যে করোনার প্রকোপ দেখেছিলাম। এই গবেষণায় দেখা গেছে অন্যান্য দেশে যেভাবে নির্দিষ্ট কিছু রক্ত গ্রæপের মানুষের কভিড হবে বা বেশি আক্রান্ত হবে এমন তথ্য দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডা. ফারহানা আক্তার বলেন, ‘বিসিজি টিকা কভিড থেকে সুরক্ষা দিতে পারে, এমন কোনো শক্ত প্রমাণ আমরা পাইনি। এছাড়াও ভবিষ্যতে সুস্থ রোগীদের এন্টিবডি’র মাত্রা নিয়ে তথ্য প্রয়োজন। তবে আরও অনেক বেশি রোগীর (অন্তত এক লাখ) এর উপর গবেষণা পরিচালিত হওয়া উচিত।



























